বুধবার, ০১ Jul ২০২৬, ০৮:১৮ অপরাহ্ন

শিরোনামঃ
জুলাই স্মরণে জামায়াতের ৩৬ দিনের কর্মসূচি অনলাইন বেটিংয়ে ৭ বছর জেল, ৫ কোটি টাকা জরিমানা হাসিনার বক্তব্য প্রচার করা নিষেধ, গণমাধ্যমকে আদালতের নির্দেশনা মানতে হবে : তথ্য উপদেষ্টা প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে বাজেট পরবর্তী নৈশভোজ বাতিল ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি বললেও থাইল্যান্ড কম্বোডিয়ার সংঘাত চলছেই ওমান উপসাগরে ট্যাঙ্কার জব্দ, ইরানে বাংলাদেশিসহ ১৮ ক্রুকে আটক মুক্তিযুদ্ধ ও ৭১ বাদ দিয়ে কোনো চেতনা বাংলাদেশের জন্য মঙ্গল নয়: শামীম হায়দার ষড়যন্ত্র চলছে, নির্বাচন অতো সহজ হবে না : তারেক রহমান হাদির ওপর হামলায় ব্যবহৃত মোটরসাইকেল শনাক্ত, মালিক গ্রেফতার দেশের সব নির্বাচন অফিসে নিরাপত্তা জোরদারের নির্দেশ

ঋণখেলাপি ৩৮ প্রতিষ্ঠান ‘বেইল আউট’ চায়

অর্থনীতি ডেস্ক, নগরকন্ঠ.কম : ব্যাংক থেকে ৫২০ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে খেলাপি হওয়ায় ৩৮টি শিল্প প্রতিষ্ঠান ‘বেইল আউট’ চাচ্ছে। দেউলিয়া অবস্থা থেকে প্রতিষ্ঠানগুলো উদ্ধারের জন্য আর্থিকসহ সার্বিক সহায়তার জন্যই সংশ্লিষ্টরা এই সুযোগ চাচ্ছে। এতে প্রতিষ্ঠানগুলো রুগ্নশিল্প হিসেবে স্বীকৃতি পাবে। তবে অর্থ মন্ত্রণালয় মনে করছে স্বীকৃতি দেয়া হলে চিহ্নিত রুগ্ন শিল্পগুলোর ক্ষেত্রে অনারোপিত ব্যাংক ঋণের সুদ, সুদ অনিশ্চিত খাতে রক্ষিত সুদ বা স্থগিত সুদ ও দণ্ড সুদ সম্পূর্ণভাবে বা আংশিক মওকুফ করতে হবে। এতে আর্থিক খাতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির শঙ্কা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে পাওয়া গেছে এসব তথ্য।

প্রতিষ্ঠানগুলো রুগ্ন শিল্পের স্বীকৃতি পেলে খেলাপির তকমা থেকে বের হওয়াসহ ঋণ পরিশোধে বিশেষ সুবিধা পাবে। ইতোমধ্যেই বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের পর্যবেক্ষণে এসব শিল্প রুগ্ন। সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকা পাঠিয়েছে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ)। সেখানে রুগ্ন শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া মন্ত্রণালয়ের পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন সংযুক্ত করা হয়। প্রসঙ্গত, এর আগে ৬৯টি রুগ্ন শিল্পকে বেইল আউট সুবিধা দেয়া হয়েছে।

সূত্রমতে, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় কর্তৃক চিহ্নিত ৩৮টি শিল্প প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছে ১২৫ কোটি টাকা। এসব ঋণের বিপরীতে সুদ হয়েছে ৩৯৪ কোটি টাকা। সুদ ও আসল মিলে এসব প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ব্যাংকের মোট পাওনা হয়েছে ৫১৮ কোটি টাকা। তবে ঋণ নেয়া সব প্রতিষ্ঠানই খেলাপি হয়েছে।

এর আগে কয়েক ধাপে রুগ্ন শিল্পগুলোকে আর্থিক সহায়তা বাবদ সরকার তিন হাজার কোটি টাকার বেশি ভর্তুকি দিয়েছে। কিন্তু তাতে কোনো স্থায়ী সমাধান আসেনি। বরং অবিরামভাবে রুগ্ন শিল্পকে আর্থিক সুবিধা দেয়ার কারণে ব্যাংক ও অর্থনীতিতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির শঙ্কা তৈরি হয়েছে। অপর দিকে রুগ্ন শিল্পের সংখ্যাও বাড়ছেই।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, রুগ্ন শিল্প নিয়ে সরকারের ব্যয় অনেক বেশি। কারণ তাদের নানা ধরনের সুবিধা দিতে হয়। বিশেষ করে দায়দেনা পরিশোধের জন্য ঋণ ব্লকড অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর, মরেটরিয়াম সুবিধা প্রদান ও নমনীয় পরিশোধের ব্যবস্থা দিতে হয়। এছাড়া অনারোপিত সুদ, সুদ অনিশ্চিত খাতে রক্ষিত সুদ ও দণ্ড সুদ মওকুফ (সম্পূর্ণ বা আংশিক) করতে হয়। এ পরিস্থিতিতে সরকার রুগ্ন শিল্পের ক্ষেত্রে ব্যাংকের সুদ মওকুফ ও ভর্তুকি প্রদানের মতো সব ধরনের সহায়তার অবস্থান থেকে সরে আসতে চাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে ব্যয় সংকোচনের লক্ষ্যে সরকার রুগ্ন শিল্পের সব ধরনের সহায়তা বন্ধের বিষয়টি বিবেচনা করছে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিল অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আলী খোকন যুগান্তরকে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে এ শিল্প খাত থেকে বের হওয়ার মতো কোনো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি। অতীতে অনেক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার পর তাদের প্রকল্পগুলো নার্সিং করেনি। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে অতিরিক্ত ব্যাংক ঋণ নিয়েছে। ব্যাংক ঋণের কারণে রুগ্ন হয়েছে। মূলত ওইসব প্রতিষ্ঠান বেইল আউট চাচ্ছে বা চাইতে পারে। অনেক প্রতিষ্ঠান ঋণ নিয়ে অন্যত্র স্থানান্তর করে শিল্পকে রুগ্ন দেখিয়ে বেইল আউট চায় এমনটি হচ্ছে কি এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি যুগান্তরকে বলেন, হতে পারে। কিন্তু না জেনে আমি কোনো মন্তব্য করতে পারব না।

জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের সাইলো রোডে ১৯৯০ সালে স্থাপন করা হয় নিউ রাখী টেক্সটাইল মিল। সেখানে সোনালী ব্যাংক বৈদেশিক শাখা থেকে ঋণ নিয়ে শিল্পটি চালু করলেও শেষ পর্যন্ত অর্থ পরিশোধ করা হয়নি। বর্তমান এ শিল্পের অনুকূলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩০০ কোটি টাকা। এ শিল্প এখন রুগ্ন হিসেবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের স্বীকৃতি চেয়েছে। এছাড়া ১৯৮৬ সালে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে খালেক টেক্সটাইল মিলস স্থাপন করা হয়। বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (বিডিবিএল) প্রধান শাখা ও আইসিবি থেকে প্রায় ১৯ কোটি টাকা ঋণ নেয়ার পরও শিল্পটি এগোতে পারেনি। এই প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ হচ্ছে প্রায় ৪৪ কোটি টাকা। পাশাপাশি ২০০৮ সালে কুমিল্লার কাইয়ুম ড্রাইং অ্যান্ড প্রিন্টিং মিলস স্থাপন করেন আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী। তিনি ২০০৮ সালে বিডিবিএল থেকে ৩৪ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে শিল্প চালু করেন। এ শিল্পে এখন ঋণখেলাপি হয়েছে প্রায় ৪৩ কোটি টাকা। অপর ঘটনায় দেখা গেছে, ঢাকার সাভারে ১৯৯৮ সালে ফয়জুন্নেছা টেক্সটাইল মিলস চালু করেন আবদুল মান্নান মিয়া। এ জন্য ইসলামী ব্যাংকের বৈদেশিক শাখা থেকে প্রায় ২৯ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে খেলাপি হয়েছেন। এই শিল্প রুগ্ন হয়ে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৮ কোটি টাকা।

সূত্র আরও জানায়, বগুড়ার বিসিক শিল্পনগরীতে ১৯৯৮ সালে নিশাত ফেব্রিক্স চালু করেন তাহমিনা হায়দার। বগুড়ার সোনালী ব্যাংকের কর্পোরেট শাখা থেকে ওই সময় ১২ কোটি টাকা ঋণ নেন । এরপর শিল্পটি রুগ্ন হয়ে পড়লে খেলাপি ঋণের পরিমাণ হয়েছে প্রায় ২৩ কোটি টাকা। একইভাবে দেখা গেছে, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ কাটারচকে স্থাপন করা হয় সোলেয়মান টেক্সটাইল। এ প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সারোয়ার উদ্দিন বিডিবিএল থেকে ঋণ নিয়েছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠান রুগ্ন হওয়ায় খেলাপিতে পরিণত হয়েছেন। বর্তমান এ প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে খেলাপি ঋণ হচ্ছে ২২ কোটি টাকা।

খেলাপি ঋণের তালিকায় আরও আছেন সিগনাজ ফ্যাশন লিমিটেড। নারায়ণগঞ্জের টানবাজার এলাকার ১৯/্এ এস এম মালে রোডে ২০০০ সালে গড়ে তোলা হয় এ প্রতিষ্ঠানটি। সিগনাজ ফ্যাশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জহিরুল হক নারায়ণগঞ্জের সোনালী ব্যাংকের বৈদেশিক শাখা থেকে তৎকালীন প্রায় সাড়ে ৪ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে শিল্প চালু করতে পারেননি। এখন প্রতিষ্ঠানে সুদ ও আসলে খেলাপি ঋণ হয়েছে প্রায় ১৪ কোটি টাকা। এছাড়া দিনাজপুর ঘোড়াঘাট ওসমানপুরে ১৯৮৬ সালে স্থাপন করা হয় টিউলিপ টেক্সটাইল (প্রা.) লি.। এ প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শফিকুল ইসলাম চৌধুরী দিনাজপুরের বিডিবিএল থেকে ওই সময় ঋণ নিয়েছেন পৌনে দু’ কোটি টাকার ওপরে। পরে প্রতিষ্ঠানটি চালাতে পারেনি। এখন খেলাপি ঋণের পরিমাণ হয়েছে প্রায় ১১ কোটি টাকা। একইভাবে নরসিংদীর বাসাইলে ১৯৯৬ সালে গড়ে তোলা হয় স্টার ডাইং অ্যান্ড ফিনিশিং মিলস। সোনালী ব্যাংক নরসিংদী শাখা থেকে প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক খাজা উদ্দিন ভুঁইয়া ঋণ গ্রহণ করেন প্রায় সোয়া তিন কোটি টাকা। কিন্তু ঋণ নিয়ে খেলাপি হয়ে প্রতিষ্ঠানটি রুগ্ন হয়। বর্তমান এ প্রতিষ্ঠানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ হচ্ছে ১০ কোটি টাকা।

অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো প্রতিবেদনে আরও যেসব প্রতিষ্ঠান রুগ্ন হয়ে বেইল আউট হতে চাচ্ছে, সেগুলো হচ্ছে নারায়ণগঞ্জের মুন্নুজান এক্সেসরিজ ইন্ডাস্ট্রিজ, সিদ্ধিরগঞ্জের আফরিন ফেব্রিক্স, মুন্সীগঞ্জ টঙ্গীবাড়ী বেতকা এলাকার এফইউ টাওয়েল ইন্ডাষ্ট্রিজ ও পাবনার ক্রিসেন্ট টেক্সটাইল মিলস। এছাড়া রাজবাড়ীর বঙ্গশ্রী বস্ত্র শিল্প, চট্টগ্রামের এনএফজেড টেরী টেক্সটাইল, নরসিংদীর সিদ্দিক টেক্সটাইল মিলস, সিদ্দিরগঞ্জ মিশরাইলের ১৯১ প্লটে পাইটেক্স (প্রা.) লি ও ১৬৮ গোদনাইল প্রেস হাউসে এফটেক্স লি.।

বেইল আউট তালিকায় আরও আছে রূপগঞ্জে আল-ফাতাহ টেক্সটাইল, বস্ত্র শিল্প লি., টঙ্গীর মাছুমপুরে এনআর টেক্সটাইল মিলস, সার্প টাওয়েল ইন্ডাস্ট্র্রিজ লি., গাজীপুরের মাহতাব নিট ইন্ডাস্ট্রিজ, কাচপুরে মুন্নুজান এক্সেসরিজ, চটগ্রামের র‌্যালি টেক্সটাইল মিলস, কুমিল্লা ফেব্রিক্স লি, গাজীপুরে সাইমেক্স ফেব্রিক্স, ফতুল্লায় ক্যালিস টেরি টাওয়াল, নরসিংদীর সবুজ বাংলা টেক্সটাইল, নারায়ণগঞ্জের এম. এইচ অ্যাপারেল ও ইরান টেক্সটাইল, মেসার্স প্রগতি কম্পোজিট মিলস, জাগরণ টেক্সটাইল, সাঈদ টেক্সটাইল, খালেক টেক্সটাইল মিলস, টেক্স ওয়ান (বিডি) লি., এম এইচ অ্যপারেলস, আল-ফালাহ নিট গার্মেন্টস।

নগরকন্ঠ.কম/এআর

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2017 Nagarkantha.com